Skip to main content

সৈয়দ মুহাম্মদ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী

কুতুবুল আকতাব হযরত খাজা সৈয়দ মুহাম্মদ কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী (উর্দু: حضرت خواجہ سیّد محمد قطب الدین بختیار کاکی) (জন্ম ১১৭৩-মৃত্যু ১২৩৫) ছিলেন একজন মুসলিম সুফি সাধক। তিনি চিশতিয়া তরিকার সাধক ছিলেন। তিনি খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির শিষ্য এবং খলিফা ছিলেন। তার নামেই দিল্লীর বিখ্যাত কুতুব মিনার উৎসর্গ করা হয়। শিষ্যত্ব গ্রহণ করার আগেই চিশতিয়া তরিকা শুধুমাত্র আজমির এবং নাগাউর এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দিল্লিতে স্থায়ীভাবে এই তরিকাকে প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। তাঁর দরগাহ (সমাধি) মেহরাউলের জাফর মহলের পাশেই অবস্থিত এবং পুরানো দরগাহ দিল্লিতে অবস্থিত, যেখানে তাঁর ওরশ পালিত হয়। ভারতের অনেক বিখ্যাত শাসক তাঁর ওরশ মহাসমারোহে উদযাপন করতেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কুতুবউদ্দিন আইবাক, ইলতুতমিশ যিনি কাকীর জন্য “ঘান্দাক কি বাউলি” নামে এক গভীর নলকূপ স্থাপন করেন, শের শাহ সুরি যিনি একটি বড় গেইট তৈরী করেন, বাহাদুর শাহ ১ যিনি দরগাহের পাশে মতি মসজিদ নির্মাণ করেন, ফারুকশিয়ার যিনি মার্বেলের স্ক্রিন এবং মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত শিষ্য এবং খলিফা হলেন ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকার যিনি আবার দিল্লির বিখ্যাত সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়ার পীর (সূফি গুরু)। নিজামউদ্দির আউলিয়ার শিষ্য হলেন মুসলিম সুফি সাধক কবি আমির খসরু এবং নাসিরুদ্দিন চিরাগ-ই-দিল্লি এর পীর।

দ্রুত তথ্য: ধর্ম, বংশ ...

প্রাথমিক জীবন

কুতুব উদ্দিন বখতেয়ার কাকি ৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ কিরগিন্তানের উশ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ষোলতম শতাব্দিতে মোগল সম্রাট আকবরের উজির আবুল ফজল ইবনে মোবারক রচিত কুতুবউদ্দিনের জীবনী ‘‘আইন-ই- আকবর” তে উল্লেথ করা হয়, তাঁর পিতার নাম কামালুদ্দিন, কুতুবউদ্দিনের দেড় বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। খাজা কুতুবউদ্দিন এর আসল নাম বখতিয়ার এবং পরবর্তে কুতুবউদ্দিন নামটা দেয়া হয়। তিনি হোসাইন ইবলে আলী মাধ্যমে হয়ে হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর বংশের সাথে মিলিত হয়েছেন। তার মা, যিনি নিজেই একজন শিক্ষিত মহিলা ছিলেন, তাঁর শিক্ষার জন্য শাইখ আবু হিফসকে নিয়োগ দেন। মঈনুদ্দিন চিশতি তার ভ্রমণের সময় যখন আউশ দিয়ে যাচ্ছিলেন,খাজা বখতিয়ার তাঁর হাতে বায়াত দান করেন এবং তাঁর থেকে খেলাফত গ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি মঈনুদ্দিন চিশতির প্রথম খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন।

দিল্লী গমন

দিল্লী সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ইতুতমিশের (১২১১-১২৩৬) এর অবসরের সময় নিজ পীরের, মঈনুদ্দিন চিশতি, একান্ত ইচ্ছায় খাজা বখতিয়ার দিল্লিতে চলে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। বখতিয়ারের আধ্যাত্বিক ক্ষমতা ও দক্ষতা এবং মানবতার অপার মহিমা অবলোকন করে প্রচুর মানুষ প্রায় তাঁর সাক্ষাত লাভে প্রতিদিনি আসা যাওয়া করতেন। তিনি এই আধ্যাত্বিক পথে সাধারণ মানুষকে বায়াত দানও শুরু করে দিয়েছিলেন।

ফলাফলের বা প্রতিদানের আশা না করে অভাবগ্রস্থদের সাহায্য করার মতাদর্শের বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য, ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকার , তাঁকে কবচের (তাবিজ) বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করেন যেগুলো ছিল বির্তকিত কেননা এগুলো ইসলামে মূর্তিপূজার মত ধর্মীয় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এর উত্তরে কাকি বলেন, ইচ্ছা বা বাসনার পরিপূর্ণতা হওয়া কোন কিছুর উপর নির্ভর করে না, কবচ বা তাবিজে আল্লাহর নাম এবং তাঁর কথা বা আয়াত রয়েছে এবং এগুলো মানুষকে দেয়া যাবে।  সেমায় নিমগ্ন হয়ে তিনি চিশতিয়া তরিকার আধ্যাত্বিক সঙ্গীতের ঐতিহ্যকে বজায় রাখেন এবং আরো সমৃদ্ধ করেন। ধারণা করা হয় যে হিন্দু ধর্মে ভক্তি নিবেদনের সঙ্গীতের সাথে সুরের সমন্বয় করা হয়, যাতে স্থানীয় মানুষদের সাথে সর্ম্পক স্থাপনের সহায়ক হিসেবে কাজ করে এবং দুই সম্প্রদায়ের মাঝে পারষ্পরিক সমন্বয় সহজ হয়। ১৪ রবিউল আউয়াল ৬৩৩ হিজরীতে (২৭ নভেম্বর ১২৩৫ খ্রিস্টাব্দ)  তিনি একটি সেমা মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন যেখানে কবি আহমদ-এ-জাম নিম্নোক্ত পংক্তিটি গেয়ে শুনান:

“যারা আত্মসর্ম্পণের খঞ্জরে নিহত হয়েছে, 
অদৃশ্য থেকে তাঁরা প্রতিনিয়ত নব জীবন প্রাপ্ত হয়।”

খাজা বখতিয়ার কাকি এই আধ্যাত্বিক পঙক্তি দ্বারা এতটাই পরমান্দ লাভ করলেন যে তিনি ততক্ষণাৎ মূর্ছা গেলেন। ঐ আধ্যাত্বিক পরমান্দের মাঝেই চারদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর দরগাহ, (মাজার), দিল্লির মেহরুলে অবস্থিত কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের নিকটে জাফর মহলের পাশে অবস্থিত। তাঁর জোর নির্দেশ ছিল, মৃত্যুর পর তাঁর নামাজে জানাজার নেতৃত্ব সে ব্যক্তিই দিবেন, যিনি কখনও কোন হারাম কাজ করেননি এবং আসরের সালাত এর সুন্নত কখনও ছাড়েননি।

কাকী উপাধির ঘটনা

কাকি নামটি দিল্লীর দিল্লির একটি ঘটনার পর তাঁর উপাধি হিসেবে যুক্ত হয়। ঘটনাসুরে, তিনি তাদের চরম দরিদ্রতা, দারিদ্র সত্ত্বেও স্থানীয় রুটিওয়ালা থেকে ঋণ না নিতে তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিষেদ করেন। পরবর্ তিনি স্ত্রীকে বলেন, যখনই প্রয়োজন হবে তখন ঘরের এক কোণা থেকে যেন কাক (এক ধরনের রুটি) নেন। এরপর, যখনই প্রয়োজন হত আশ্চর্জনকভাবে তারঁ স্ত্রী ঘরের কোণা থেকে কাক পেয়ে যেত। ইতিমধ্যে রুটিওয়ালা এটা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল যে, কেন খাজা ঋণ নেয়া বন্ধ করে দিল। তিনি চিন্তা করলেন হয়ত তিনি প্রায়শ খাজার সাথে রাগারাগি করতেন, সেজন্য খাজা ঋণ নেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে, রুটিওয়ালার স্ত্রী কুতুবউদ্দিনের স্ত্রীর কাছ থেকে এর কারণ জানতে চাইলেন। তিনি তাকে কাক এর আশ্চর্ জনক ঘটনাটি বর্ণা করলেন। এই গোপন রহস্যটি উন্মোচিত হওয়ার পর যদিও কাক আসা বন্ধ হয়ে যায়, ঐ দিন থেকে মানুষ কুতুবউদ্দিকে কাকি নামে সম্বোধিত করতে থাকে।

কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকির দরগাহ

মতাদর্শ

চিশতিয়া তরিকার অন্যান্য সাধকদের মত খাজা বখতেয়ার কাকি কোন আনুণ্ঠানিক মতবাদ প্রণয়ন করেননি। তিনি সবসময় মজলিসের আয়োজন করতেন যেখানে তিনি তরিকতের গোপন রহস্য তত্ত্ব নিজ শিষ্যদের কাছে উন্মোচিত করতেন। জনসাধারণের মধ্যে পরিচালিত এই মজলিসে যেসব বিষয়ের উপর জোর দেয়া হতে সেগেুলো হল- আত্ম-ত্যাগ ও বাসনা শূণ্য প্রেম, আল্লাহর উপর সম্পূর্ বিশ্বাস, সকল মানুষকে একইরূপ আচরণ করা এবং যঘাসাধ্য তাদের সাহায্য করাসহ ইত্যাদি। তাকে যেসব অর্ দান করা হত, তিনি সে দিনই ঐ অর্ দান করে দিতেন। ফলাফলের বা প্রতিদানের আশা না করে অভাবগ্রস্থদের সাহায্য করার মতাদর্কের বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।

প্রভাব

সূফি সধক হিসেবে খাজা বখতেয়ার কাকি মানুষের উপর প্রচন্ডভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। তিনি তখনকার সরকারের সাথে জড়িত না থাকার নীতি অব্যাহত রাখেন। এটি দক্ষিণ এশিয়ার চিশতিয়া তরিকার সাধকদের পরম্পরা যে, তার মনে করেন শাসকগোষ্ঠী এবং সরকারের সাখে সম্পর্ তাদেরকে দুনিয়াবি চিস্তা ভাবনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে পারে।

কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর উপাধি

কুতুব-উল-আকতাবমালিক- উল - মাশায়খরাইস-উস-সালেকীনসিরাজ-উল-আউলিয়াMoti Masjid, Mehrauli, built by Bahadur Shah I.

গবেষণা

দিওয়নে-এ-বখতেয়ার উদ্দিন কাকী (উর্দু ভাষায়)। কানপুর মুন্সি নাভাল কিসুর। ১৮৭৯।

গ্যালারী

কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী, মেহরাউলি

Courtyard of the Qutbuddin Bakhtiyar Kaki's dargah complex.

Entrance to grave enclosure within Qutbuddin Bakhtiyar Kaki's dargah compound.

Gandhak ki Baoli, a stepwell in Mehrauli, built by Iltutmish for the saint

Comments

Popular posts from this blog

নক্ শেবন্দিয়া ও মোজাদ্দেদিয়া তরিকার শাজরা

        শাজ্ রায়ে তরিকায়ে নক্ শবন্দিয়া                মোজাদ্দাদিয়ার বিবরণ আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আবদুল হাইর পীরঃ হজরত মাওলানা শাহ সূফি হাফেজ মোহাম্মদ আবদুর রব সাহে...

আল্লামা রেজভি সাহেব

পরিচয়ঃ  আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে তিনি উজ্জল নক্ষত্র ছিলেন। যিনি শরীয়ত ও মারেফাতের অতি উচ্চ মর্যাদাশালী আল্লাহর অলী। তাঁর পারিবারিক সূত্র থেকে কিংবা কোন দালিলিক ভিত্তি থেকে তাঁর জন্মসাল ও তারিখ সম্পর্কে নির্ভর যোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। তাঁর জীবনী প্রকাশে আত্মনিবেদিত দীর্ঘদিন তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া মোশাররফ ভুইয়া জানান তাঁর জন্ম হয়েছিল বৈশাখ মাসের এক তারিখ।সর্বশেষ ধারণা করা হয় তিনি হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রায় ১২৮০ হিজরী সনে মোজাদ্দেদে জামান, ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী আকবর আলী রেজভী সুন্নী আল ক্বাদেরী মাদ্দা জিল্লুহুল আলী বাংলাদেশের ময়মহনসিংহ জেলার লংঙ্কাখলা গ্রামে শুভাগমন করেন। যিনির পিতা ছিলেন একজন সুযোগ্য আলেম, আল্লামা মাওলানা শহর আলী রেজভী সুন্নী আল ক্বাদেরী এবং মাতার নাম আলিমা আক্তার রেজভী। আল্লামা রেজভী সাহেব হুজুর কেবলা এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের জমিনে আগমন করেন, যখন ইংরেজ শাসন করছিল এই ভারত উপমহাদেশে। মুসলমানদের সমাজে রাসুলে পাকের হাজার হাজার সুন্নাত দাফন করে নতুন নতুন বিদাত চালু করে। এই যুগ সন্ধিক্ষণে তিনি বাতিল ফেরকাদের সাথে মুনাজারা করে হাজার ও ম...

আল্লামা রেজভি সাহেব ২

দুনিয়া থেকে পর্দা গ্রহণের বেলায় কারামাতঃ   মোজাদ্দেদে জামান, ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী আকবর আলী রেজভী সুন্নী আল ক্বাদেরী মাদ্দা জিল্লুহুল আলী  হুজুর কেবলার দুনিয়া থেকে পর্দা করার আগে জলন্ত কারামত প্রকাশ পেয়েছে। “কারামাতুল আউলিয়াই হাক্কোন” (আকাইদে নছফী, আল্লামা সাদুদ্দিন তাফতাজানি রহঃ) অর্থাৎ অলি আল্লাহরগনের কারামত সত্য। ১)  তিনি আগেই বলতেন যে, আমি রবিবারে পর্দা করবো, ঠিকই তিনি রবি বারে পর্দা করেছেন। ২)  তিনি পর্দা করার আগের দিন,অর্থাৎ শনিবার দিন, তিনির নাতি মুফতি কুদ্দুস রেজভী, মুহাম্মদ রেজভী, মাওলানা বদরুল আমিন রেজভী, সহ আরো অনেকেই ছিল তাদেরকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা শোন আগামি কাল ঈদের দিন। আর তোমরা খাসী ও আবাল কুরবানী দিও না। আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতকে শক্ত ভাবে আকড়ে ধরবে। ৩)  তিনি পর্দা করার আধ ঘন্টা আগেই বলে দিলেন যে, আমি আধ ঘন্টার ভিতরে পর্দা করবো, ঠিকই তিনি আধ ঘন্টার ভিতরে পর্দা করলেন। ৪)  তিনির গোসল করাইলেন আল্লামা মুফতী উহিদুর রহমান রেজভী ও আল্লামা গাজী মান্নান জিহাদী , মুফতী রমজান আলী রেজভী ও পাশে ছিলেন। যখন বাবা...