Skip to main content

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলভী (রহ) পর্ব ১

দার্শনিক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহও তাঁর চিন্তাধারা

হিজরী পঞ্চম শতক পর্যন্ত মুসলমানগণ সাহিত্য, সংস্কৃতি, কাব্য, ইতিহাস, দর্শন, আইনশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র চিকিৎসাশাস্ত্র, রসায়নশাস্ত্র, স্থাপত্যশিল্প, রাজ্য জয় তথা বৈষয়িক দিক থেকে সমগ্র বিশ্বে উন্নতির উত্তুঙ্গ চৃড়ায় সমাসীন থাকলেও তার পরবর্তীকালে সারা মুসলিম জাহানে চিন্তার বন্ধ্যান্ত্ব দেখা দেয়। বিশেষ করে ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে এমন স্থবিরতা পরিলক্ষিত হয় যে, ইসলামী জ্ঞান-গবেষণা ও স্বাধীন চিন্তার দ্বার এক রকম বন্ধ হয়ে যায়। এমন কি কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা ও তার ব্যাখ্যার ব্যাপারে কেবল চোখ বুঁজে পূর্ববর্তীদের অনুসরণই  করা হতো না বরং অনেক জটিল সমস্যার ক্ষেত্রেও মনে করা হতো যে, এ ব্যাপারে উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর গবেষণার যুগ হিজরী চতুর্থ শতক পর্যন্তই শেষ হয়ে গেছে এবং পরবর্তী লোকদের এ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার কোন অধিকার নেই।
এছাড়া এমনিতেও দেখা যায়, খুলাফায়ে রাশেদীনের পর থেকে চতুর্থ হিজরী পর্যন্ত ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ ইমাম-মুজতাহিদগণ এক দিকে বেসরকারী পর্যায়ে ইসলামী চিন্তা-গবেষণায় রত রয়েছেন, অপরদিকে ক্ষমতালোভীগণ ইসলামী মূল্যবোধকে নানাভাবে ব্যাহত করে আসছে। বনী উমাইয়া ও আবাসিয়াদের শাসনামলে (উমর ইবনে আবদুল আযীয ছাড়া) ইসলামের সাংস্কৃতিক জীবন এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হয়। গ্রীক সাহিত্য-দর্শনের নির্বিচার তরজমা ও প্রচার মুসলমানদের চিন্তা জগতে এক নৈরাজ্যের সূচনা করে। শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সাহায্যে সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি ও তমদ্দুনের ক্ষেত্রে জাহেলী যুগের চিন্তাধারার প্রসাবের ব্যবস্থা করে। হিজরী পাঁচ শতকের শেষার্ধে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, গ্রীক সাহিত্যানুরাগ ও দর্শন-প্রীতির প্রবণতা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যায়। মুসলিম শাসক ও জনগণের আকীদা-বিশ্বাস ও নৈতিক চরিত্রের মারাত্নক অবনতি ঘটে। এক শ্রেণীর আলিম, ফকিহ, মুফতী বিজাতীয় দর্শনের মাপকাঠি দিয়ে ইসলামী জীবন দর্শনের মূল্যায়নে সচেষ্ট হয়। তার পরবর্তী পর্যায়েও দেখা যায় মুসলিম জাহানের বিভিন্ন অংশে আরও নানাবিধ কুসংস্কার ও বাতিল চিন্তাধারা গজিয়ে উঠেছে। মানুষ এ সময় দমননীতি মূলক রাজতান্ত্রিক পরিবেশে থেকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সঠিক রূপরেখা সম্পর্কেই অপরিচিত হয়ে পড়ছিল। মানবজীবনে বিভিন্ন বিভাগের জন্য নির্ধারিত কুরআন ও সুন্নাহর অনুশাসনসমূহ তথা ইসলামের তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল। ইসলাম যে একটি পরিপূর্ণ বিজয়ী জীবন-বিধান, সাধারণ ভাবে মুসলিম সমাজ থেকে এ ধারণা বিধায় গ্রহণ করছিল। আর তার স্থান দখল করছিল সুফিবাদ তথা ইসলামের আংশিক রূপ-বরং ক্ষেত্রে বিশেষে বিকৃত রূপ-যার জের এখনও চলছে এবং এখনও কেউ কেউ আনুষ্ঠানিক কতিপয় ইবাদতকেই পূর্ণ ইসলাম বলে মনে করছে। দোর্দন্ড প্রতাপশালী রাজশক্তির অধীনে ইসলামের বৈপ্লবিক ভাবধারা নিয়ে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ এগিয়ে এলেও সমগ্র সমাজের সামগ্রিক নিস্পৃহতা ও নিরাশক্তির সম্মুখে তা সহজেই স্তিমিত হয়ে পড়ে। ঐ ভাবধারা মূলক কোন কিছু বলা ও লেখাও ছিল জীবনের পক্ষে বিরাট ঝুঁকির ব্যাপার। এ ছাড়া ঐ পরিবেশে ইসলামকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে অনুসৃত কৌশলগত নীতিরও ছিল তা পরিপন্হী। এসব কারণে মহানবী (সা) ও তাঁর ত্যাগী সাহাবীগণ প্রাণান্তকর সংগ্রাম সাধনার দ্বারা জাহিলিয়াতের সকল দুর্ভেদ্য প্রাচির চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মানব জাতির সামনে যে আল্লাহ প্রদ্ত্ত জীবনবিধান পেশ করেছিলেন, ক্রমে তা থেকে মুসলমানদের বিচ্যূতি ঘটতে থাকে।

উপমহাদেশের অবস্থা

একদিকে ইসলামের ব্যাপারে সুষ্ঠু জ্ঞান-গবেষণার অভাব, অপরদিকে নিত্য নতুন ভ্রান্ত চিন্তাধারার উদ্ভাব-এ উভয় অবস্হার মধ্য দিয়ে যখন ইসলাম গতিশীলতা হারিয়ে দ্বাদশ হিজরীতে পদার্পণ করে, তখন এই চিন্তার দিক থেকে গোটা মুসলিম সমাজ বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের অবস্হা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। এখানে স্বার্থদুষ্ট মুসলিম শাসকদের হাতে ইসলাম যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল, তা আর কোথাও হয়নি।কেননা, দুই একজন ছাড়া দিল্লীর মুসলিম রাজা-বাদশাহরা পাক-ভারতে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু করা তো দূরের কথা বরং ইসলামী আদর্শের খেলাপ নানারূপ কাজ করে এ দেশের সাধারণ মানুষের সামনে ইসলামের এক বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরে। মোগলদের আমলে বিশেষ করে হিজরী দশম শতাব্দীর শের্ষাধ থেকে পরিস্হিতির আশংকাজনক অবনতি ঘটে। ইসলামের সঙ্গে সম্রাট আকবরের (৯৬৪-১০৬৪ হিঃ) সীমাহীন ধৃষ্টতা মুসলিম সমাজ জীবনে বিরাট বিষফোঁড়ার সৃষ্টি করে। সম্রাট আকবর যে কোন মূল্যে হিন্দুদের মন রক্ষার পক্ষপাতি ছিলেন। আকবরের ধারণা ছিল এই যে, প্রয়োজনে হিন্দুদের সক্রিয় সমর্থন ভিন্ন কেবল মাত্র সংখ্যালঘু মুসলমানদের শক্তির ওপর মোগল শাসন ভারতে দীর্ঘ স্হায়ী হতে পারে না। তাই পূর্বপুরুষদের সিংহাসন সংরক্ষণের জন্য আকবর নিজস্ব জাতীয় তাহযীব-তমদ্দুন এবং ঈমান-আকীদাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন, উপরোক্ত চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আকবর বহু হিন্দু রীতিনীতি গ্রহণ করেন এবং অমুসলমানদের উপর থেকে জিযিয়া কর প্রত্যাহা করেন। তিনি এ সবকিছুই বহু নিন্দিত সেই ‘দীনে ইলাহী’নামক নিজের উদ্ভাবিত প্রহসনমূলক ধর্মের নামেই করতেন। উল্লেখ্য যে, ৯৮৩ হিজরী  থেকে আকবরের মনে এ দুষ্টামি চেপে বসে এবং এ উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা স্হির করার জন্য এক শ্রেণীর আলিম, পীর ও হিন্দু পন্ডিত ছাড়াও শিয়া, খৃষ্টান, ইয়াহুদি. অগ্নিপূজক প্রভৃতি ধর্মের পন্ডিতদেরও দরবারে হাযির করেন। পরে প্রত্যেকের বক্তব্যের আলোকে নিজ স্বার্থ বুদ্ধিকে কার্যকরী করেন এবং ৯৯০ হিজরীতে ‘দীনে-ইলাহী’ প্রতিষ্ঠার সরকারী ঘোষণা করেন। আকবরের এই গোমরাহীর পশ্চাতে ইসলাম সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার সাথে সাথে তাঁর অমুসলিম বেগমদের গভীর প্রভাবও কাজ করেছিল। হেরেমে হিন্দু রমণীদের অস্তিত্ব গোটা পরিবেশকে হিন্দু বানাবার জন্য যথেষ্ট ছিল। প্রাঁসাদের অভ্যন্তরে নানা ধর্মের উপাসনালয় নির্মাণ করা হয়। হিন্দু মেলা-তেহারের সময় সম্রাটের প্রাসাদে সাধারণ উৎসব পালন করা হতো। সন্ধ্যা বাতির সময় আকবর দাঁড়িয়ে সম্মান গ্রহণ করতেন। আযান ও গরু যবাই নিষিদ্ধ। ছিল। দরবারের লোকদের পোষাক- পরিচ্ছনদ সম্পূর্ণ হিন্দুয়ানী ছিল।মুসলিমদের মুখ থেকে দাড়ি বিলুপ্ত হতে শুরু করলো। এক কথায় সারাটি পরিবেশ, প্রাসাদের যাবতীয় কাজকর্ম, রীতিনীতি, অনুষ্ঠান একান্তভাবেই হিন্দু সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ছিল। ঐ যুগের পোষাক, স্থাপত্য, চিত্রনির্মাণ সকল কিছুর মধ্যেই হিন্দু সংস্কৃতির ছাপ লক্ষ্য করা যেতো। ফতেহপুর সিক্রির সমজিদ ও শায়খ সলীম চিশতীর সমাধি একইভাবে হিন্দু স্থাপত্যের প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা হয়। শায়খ সলীম চিশতীর সমাধি সম্পর্কে বিখ্যাত ইংরেজ লেখক উইনস্টন স্মিথ সন্তব্য করতে গিয়ে বলেনঃ “মুসলমান সমাজের একজন তেজস্বী মহান আধ্যাত্মিক সাধকের সমধিগাত্রে হিন্দু সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের প্রতিক লক্ষ্য করে আমি বিস্মিত হয়েছি। গোটা সমাধি সৌধটিতেই হিন্দু ভাবধারার অভিব্যাক্তি সুস্পষ্ট। (Akbar the Great Mughal. P.P. 442-443) এমনিভাবে Henell- এর মন্তব্যও লক্ষণীয়। তিনি বলেনঃ “ফতেহপুরের মসজিদটিকে মসজিদ অপেক্ষা বৈষ্ণাব মন্দির বলে মনে হয়।“ (A Hand Book of Indian Art, p 65)।

এক শ্রণীর আলিমের ভূমিকা

আকবরের এই পথভ্রস্টতার জন্য তৎকালীন সরকারের এক শ্রেণীর তল্পিবাহক আলিম এবং পীরও কম দায়ী নন। তাদের পাস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহ, হিংদ্ধতা এবং দীন ইসলামের মূল দাবীর ব্যাপারে জ্ঞানের স্বল্পতা বা অজ্ঞাতা আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করেছে। ক্ষমতাসীনদের প্রতি তাদের দুর্বলতা, কাপুরুষতা এবং দীনের ব্যাপরে তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই তারা ৯৮৭ হিজরী সনে আকবরকে “যিল্লুল্লাহ” (আল্লাহর ছায়া বা রহমত), ন্যায়পরায়ণ নেতা’‘যুগ ইমাম’’তিনি সকল আনুগত্যের উর্ধে’ তাঁর হুকুমই সকলের উপর প্রযোজ্য’ প্রভৃতি আল্লাহর গুণে অভিহিত করে ফতোয়া জারি করতে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করেননি। তাঁর প্রতি সম্মানসূচক সিজদ করারও ফতোয়া তাঁরা দিয়েছিলেন। মরহুম মওলানা আবুল কালাম আযাদ এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেনঃ “আকবরের শাসনামলে মখদুমুল মুলক ও আবদুন নবীর মতো ওলামায়ছূ- অসৎ আলিমরা [ ইসলামী ইতিহাসে বিভিন্ন যুগের বিকৃত ঈমান ও বিকৃত আমলের আলিদেরকে ‘ওলামায়ে ছূ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শব্দটি বর্তমানে একটি পরিভাষা হিসেবে প্রচলিত। তাযকিরা, পৃষ্ঠাঃ ২১।] উক্ত ফতোয়ায় দস্তখত করে নিজেদেরকে যে কঠোর শাস্তির যোগ্য করেছে, তাদের প্রতি আল্লাহ কি ধরনের ব্যবহার করবেন সেটা তিনিই ভালো জানেন। তাবে এতে কোন সন্দহে  নেই যে, ঐ সকল আলিম এহেন নিন্দানীয় কাজের মাধ্যে যে চরম অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে, তার দৃষ্টান্ত অতি বিরল। সত্য কথা বলতে কি, বিভিন্ন যুগে ইসলামের ওপর যত আঘাত এসেছে এহেন‘ওলামায়ে ছু’ এর কারণেই এসেছে। আমি বলবো যে, আকবরের এই গোমরাহী সৃষ্টর জন্য সব চাইতে যারা বেশী দায়ী তারা আবুল ফজল ও ফয়েজী নয় বরং এসব ‘দুনিয়ার কুকুর’ রাই অধিক দায়ী। দুর্ভাগ্য, ঐ সময় এই স্বর্থপর ব্যক্তিরাই আলিমের আবরণ পরে রেখেছিল।
যা হোক, আকবর কর্তৃক সৃষ্ট এই ঘোর তমসার বুকে পরবর্তী পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা মুজাদ্দিতে আলফেসানীর ন্যায় এক প্রচন্ড সূর্যের উদয় ঘটান এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে তাঁর দুর্বার আন্দোলন, ত্যাগ- তিতিক্ষা ও প্রতিরক্ষামূলক বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ফলে তার অবসান ঘটে। কিন্তু আলফেসানী (রহ) এই গোমরাহী  ও তার    সঙ্গে সঙ্গে  বিদআত শিরকের অপরাপর বেগবান স্রোতের গতি প্রশামিত করতে সক্ষম হলেও উক্ত দুষ্ট ক্ষতের দাগ সম্পুর্ণ মুছে যায়নি। তার কিছু জীবণু পরবর্তী পর্যায়েও অবশিষ্ট ছিল। কেননা দেখা গেছে, আকবরের ‘দীনে ইলাহীর’ অনুসারীর সংখ্যা নিতান্ত কম হলেও এর সাধারণ প্রভাব ব্যাপকভাবে সংক্রমিত ছিল। তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে যেমন, মুসলিম লেখকগণ যেখানে সাধারণত নিজ নিজ লেখা বিশেষ করে গ্রন্হাবলী ‘হামদ ‘ও ‘নাত দ্বারা শুরু করতেন সে ক্ষেত্রে বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন সরকারী লোক ও শাহী দরবারের মূসলান লেখকগণ নিজেদের হিন্দু সংস্কৃতি ভাষার গ্রন্হাদির সুচনা করতেন গনেশ বা স্বরসতী প্রভৃতি হিন্দু দেব- দেবীর নামে। এ ছাড়া ‘দীনে ইলাহীর ধারণা ও প্রভাব আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীরের আমলেই কেবল নয় তার প্রপৌত্রের আমলেও যে কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে  বিদ্যমান ছিল, তার প্রমাণ হচ্ছে দারাশিকে। শাহজাহানের পুত্র  দারাশিকো প্রথম দিকে সফী ভাবধারা প্রভাবান্বিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি ক্রমশ হিন্দু ধর্মমতের প্রতি ঝুকে পড়েন। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় বহু হিন্দু ধর্মগ্রন্হ ফারসী ভাষায় অনুদিত হয়। হিন্দু সর্বশ্বরবাদের পরিভাষার সাথে স্বমতের পরিভাষা সম্পর্কে আলোচনা করে তিনি নিবন্ধ রচনা করেন। তিনি হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের সমম্বয় সাধনের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। তঁর এই চিন্তাধারা লক্ষ্যে- অলক্ষ্যে অনেক নিষ্ঠাবান সুফীদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়ে পড়ে। দারাশিকো এভাবে সুফিদের দ্বারা ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের মধ্যে সাধারণ ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন (islam the Straight path)
সম্রাট আওরঙ্গজেব (১০৬৮- ১১১৮ হিজরী) ও দারাশিকোর বিরোদ এবং পরিনামে দারাশিকোর বিরোধ এবং পরিণামে দারাশিকোর  পরাজয় ও নিহত হবার পেছনে মূলত এ কারণই কার্যকর ছিল। উভয়ের বিরোধকে দুই ভাইয়ের রাজক্ষমাত দখলের ঝগড়া মনে করা কিছুতেই ঠিক হবে না। বরং এ বিরোধ ছিল দুটি চিন্তাধারার এবং দুটি আদর্শে। আবুল মুযাফফর মুহিউদ্দিন আলমগির আওরঙ্গজেব চেয়েছিলেন উপমহাদেশে মহানবীর আদর্শ তথা ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং দারাশিকো চেয়েছিলেন এখানে প্রপিতামহ আকবরের মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে। কারো কারো মতে দারাশিকো ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হলে মোগল সাম্রাজ্য আজো টিকে থাকতো এবং টিকে না থাকলেও উপমহাদেশ থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো। এসব কারণেই আওঙ্গজেবের মতো ইসলামী আদর্শের পূর্ণ অনুসারী একজন মুসলিম শাসকের যুগ অতিক্রন্ত হবার পরও দেখা গেছে যে, পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত শাসকের অযোগ্যতায় সেই হিন্দুয়ানী ভাবধারা এবং এরই সঙ্গে শিয়া মতবাদ ও নানাবিধ অনৈসলামিক ভাবধারাপুষ্ট ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মুজাদ্দিদে আলফেসানী (৯৭১-১০৩৪ হিজরী) ও পরবর্তীকালে সাধক সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রচেষ্টায় যেসব অনৈসলামী রীতিনীতে ও ভাবধারা বিলপ্ত হয়ে গিয়েছিল, উক্ত শাসকের দুর্বলতার সুযোগে সেগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়ে এঠে। এ ছিল পাক-ভাবতের সাধারণ অবস্থ। তার পাশাপাশি সমাজের শিক্ষার অঙ্গন এবং সুধীমহল তথা ওলামা ও পীর- মাশায়েখদের কার্যকলাপ ছিল আরও আরও অধঃপতিত। এক ধরনের সুফী ও ফকীর দরবেশ নামাধারী ব্যক্তি ফকীরী মারেফতীর ছদ্মবরণে সাধারণ মানুষের ধন-সম্প লুট করে যেতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তখনো এরিস্টটালের প্রচারিত মতবাদের পচা লাশের ওপর অস্ত্রোপচার চলছিল। মাদ্রাসাগুলোতে ‘শামসে বাজেগা’ও ‘কাযী মুবারক ‘ বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পঠিত হলেও কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে চিন্তা গবেষণার প্রতি করুরই ভ্রক্ষেপ ছিল না। মূলত ‘উলুমে ইলাহিয়া’র মধ্যে তাঁরা এতই নিমগ্ন থাকতেন যে, ‘কালামে ইলাহীর’র প্রতি ভ্রক্ষেপ করার সময়ই তাদের হাতে থাকতো না। তৎকালীন সাধারণ শিক্ষা তথা দরসে নিজমী [ বর্তমান সময়ের প্রচালিত কওমী মাদ্রাসার শিক্ষানীতি।]  থেকে যদি কোন বিষয় পাঠ্যের বহির্ভূত থেকে থাকে তো তা ছিল কুরআন মজীদ। ‘বড় বড় আলিমদের শিক্ষাচক্রেও একমাত্র মিশকাত শরীফ ও ‘মাশারেকুল- আনওয়ার’ পড়ানোকেই যথেষ্ট মনে করা হতো। অবস্থা এই ছিল যে, মুজাদ্দিদ (র) ও তাঁর সমকালীন শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ)-এর (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) চিন্তাধারা পরিবেশের আলিমগণ। মুফতিগণের অবস্থা ছিল এই যে, তঁরা ‘মাতায়াখখিরীন’ অর্থাৎ ৫ম হিজরীর পরবর্তী ফকীহ মুজদাহিদদের ফতোয়াকেই চুড়ান্ত বলে করতেন। ইবনে নাজীম (৯৭০ হিজরী) এবং মোল্লা আলী ক্বারীর (১০১৪ হিঃ) কোন ফিকহী মতের বিরুদ্ধেচরণ করা অসম্ভব ছিল। কেই এ ব্যাপারে ঔদ্ধত্য (?) দেখাতে গেলে হয়তো তাকে ওহাবী নতুন মুবতাদিন (বিদআতী) কিংবা লা- মাযহাবী ও অন্যান্য ধমীয় তিরস্কারবাপে জর্জরিত হতে হতো।
ওলামা ও শিক্ষাব্রতীদের এ অবস্থার পাশাপশি সাধারণ মুসলমান ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবস্থা আরও নৈরাশ্যজনক ছিল। জনৈক অমুসলিম লেখকের মতে ‘সাধারণভাবে উপমহাদেশে ইসলাম তার প্রাণসত্তা হারিয়ে ফেলেছিল। কেবল ইসলামের আনুষ্ঠানিক রীতিনীতি ও কল্পনা প্রসূত অলৌকিকতার প্রতি আসক্তিই প্রধান ছিল। যদি হযরত মুহাম্মদ (সা) দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় আগমন করতেন, তাহলে তিনি তাঁর এসব অনুসারীদের মধ্যে ধর্মবিমুখতা ও প্রতিমা পূজা দেখে অত্যন্ত অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। [স্টুয়ার্ড তাঁর গ্রন্হ অষ্টাদশ খৃষ্টাব্দে মুসলিম দুনিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক চিত্র তুলে ধরেছেন। আমীর শাকীব আরসালানের মতে স্টুয়ার্ডই একমাত্র লেখক যিনি মুসলিম দুনিয়ার চিত্র এমন বিজ্ঞাতার সঙ্গে ফুটেয়ে তুলেছেন, যা বিচক্ষণ মুসলিম লেখকের পক্ষেও সম্বব হয়নি। সীরায়েদ আহমদ’পৃষ্ঠা ৫০-৫১তে স্টুয়ার্ডের পূর্ণ রয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog

নক্ শেবন্দিয়া ও মোজাদ্দেদিয়া তরিকার শাজরা

        শাজ্ রায়ে তরিকায়ে নক্ শবন্দিয়া                মোজাদ্দাদিয়ার বিবরণ আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আবদুল হাইর পীরঃ হজরত মাওলানা শাহ সূফি হাফেজ মোহাম্মদ আবদুর রব সাহে...

আল্লামা রেজভি সাহেব

পরিচয়ঃ  আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে তিনি উজ্জল নক্ষত্র ছিলেন। যিনি শরীয়ত ও মারেফাতের অতি উচ্চ মর্যাদাশালী আল্লাহর অলী। তাঁর পারিবারিক সূত্র থেকে কিংবা কোন দালিলিক ভিত্তি থেকে তাঁর জন্মসাল ও তারিখ সম্পর্কে নির্ভর যোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। তাঁর জীবনী প্রকাশে আত্মনিবেদিত দীর্ঘদিন তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া মোশাররফ ভুইয়া জানান তাঁর জন্ম হয়েছিল বৈশাখ মাসের এক তারিখ।সর্বশেষ ধারণা করা হয় তিনি হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রায় ১২৮০ হিজরী সনে মোজাদ্দেদে জামান, ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী আকবর আলী রেজভী সুন্নী আল ক্বাদেরী মাদ্দা জিল্লুহুল আলী বাংলাদেশের ময়মহনসিংহ জেলার লংঙ্কাখলা গ্রামে শুভাগমন করেন। যিনির পিতা ছিলেন একজন সুযোগ্য আলেম, আল্লামা মাওলানা শহর আলী রেজভী সুন্নী আল ক্বাদেরী এবং মাতার নাম আলিমা আক্তার রেজভী। আল্লামা রেজভী সাহেব হুজুর কেবলা এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের জমিনে আগমন করেন, যখন ইংরেজ শাসন করছিল এই ভারত উপমহাদেশে। মুসলমানদের সমাজে রাসুলে পাকের হাজার হাজার সুন্নাত দাফন করে নতুন নতুন বিদাত চালু করে। এই যুগ সন্ধিক্ষণে তিনি বাতিল ফেরকাদের সাথে মুনাজারা করে হাজার ও ম...

আল্লামা রেজভি সাহেব ২

দুনিয়া থেকে পর্দা গ্রহণের বেলায় কারামাতঃ   মোজাদ্দেদে জামান, ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা গাজী আকবর আলী রেজভী সুন্নী আল ক্বাদেরী মাদ্দা জিল্লুহুল আলী  হুজুর কেবলার দুনিয়া থেকে পর্দা করার আগে জলন্ত কারামত প্রকাশ পেয়েছে। “কারামাতুল আউলিয়াই হাক্কোন” (আকাইদে নছফী, আল্লামা সাদুদ্দিন তাফতাজানি রহঃ) অর্থাৎ অলি আল্লাহরগনের কারামত সত্য। ১)  তিনি আগেই বলতেন যে, আমি রবিবারে পর্দা করবো, ঠিকই তিনি রবি বারে পর্দা করেছেন। ২)  তিনি পর্দা করার আগের দিন,অর্থাৎ শনিবার দিন, তিনির নাতি মুফতি কুদ্দুস রেজভী, মুহাম্মদ রেজভী, মাওলানা বদরুল আমিন রেজভী, সহ আরো অনেকেই ছিল তাদেরকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা শোন আগামি কাল ঈদের দিন। আর তোমরা খাসী ও আবাল কুরবানী দিও না। আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর সুন্নতকে শক্ত ভাবে আকড়ে ধরবে। ৩)  তিনি পর্দা করার আধ ঘন্টা আগেই বলে দিলেন যে, আমি আধ ঘন্টার ভিতরে পর্দা করবো, ঠিকই তিনি আধ ঘন্টার ভিতরে পর্দা করলেন। ৪)  তিনির গোসল করাইলেন আল্লামা মুফতী উহিদুর রহমান রেজভী ও আল্লামা গাজী মান্নান জিহাদী , মুফতী রমজান আলী রেজভী ও পাশে ছিলেন। যখন বাবা...